শুক্রবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১০

সৃষ্টির ক্ষুদ্রতম বিষয় ও তাঁর কাছে গোপন নেই

সৃষ্টিসমূহের ক্ষুদ্রতম কোনো বিষয়ও আল্লাহ তা’য়ালার কাছে গোপন নেই ,তিনি সমস্ত কিছু জানেন। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন -() বস্তুত কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নেই,আকাশেও নয় বরং যমীনেও নয়। তিনি মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা তোমাদের আকৃতি গঠন করে থাকেন । (সূরা ইমরান ৫)
মহাকাশের প্রত্যেকটি স্তরে প্রত্যেক মহুর্তে যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে ,এই পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে তিনি সজাগ রয়েছেন এবং যা কিছুই ঘটছে ,তা তাঁরই নির্দেশে ঘটছে । সৌর ঝড় ,সূর্যের বুকে মহা প্রলয় ,প্রত্যেকটি ছায়াপথের চলমান গতি ,একটি সাথে আরেকটির সংঘর্ষ ঘটে যেন কোনো বিশৃংখলা না ঘটে এসবকিছু তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন। গ্রহ ,উপগ্রহ ,নক্ষত্র ,তারকাপুঞ্জ ও সূর্যেও ক্ষতিকর রশ্মি যেন পৃথিবীবাসীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, এসব কিছুই একমাত্র তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন।
যমীনের তলদেশ মৃত্তিকা গর্ভেও অভ্যন্তরে উত্তপ্ত সময়ের প্রত্যেক মুহুর্তে আলোড়িত হচ্ছে সেই লাভ হঠাৎ উদগিরণ হয়ে পৃথিবীর সমস্ত জীবের জন্য যেন ক্ষতির কারণ হয়ে না দাড়ায়ে ব্যাপারে তিনি সজাগ রয়েছেন। আগ্নেয়গিরি থেকে ক্ষতির গ্যাস নির্গত হয়ে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী মুহুর্তে যেন মৃত্যু মুখে পতিত না হয় এ বিষয়টি ও তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন। সমস্ত সাগর মহাসাগরের পানি একই মুহুর্তে জলোচ্ছাসের সৃষ্টি করে পৃথিবীর যমীনকে তলিয়ে দিতে না পারে এসব যাবতীয় বিষয় তিনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন।
মায়ের গর্ভে -যেখানে কোনো মানুষের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নেই ,সেখানে কার কি আকৃতি হবে ,কার হাতের আঙ্গুল দশটির স্থানে বারটি হবে, কার এক পা ছোট আরেক পা বড় হবে ,কে কুৎসিত দর্শন হবে আর কে সুশ্রী হবে, কে মুক- বধির হবে আর কে বাক ও শ্রবণশক্তি সম্পন্ন হবে এসব কিছুই তিনি নিয়ন্ত্রণ করছেন। অর্থাৎ সর্বত্র তাঁর ক্ষমতা ও জ্ঞান ক্রিয়াশীল রয়েছে জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাকে এভাবে তাঁর কাছে দোয়া করতে শিখিয়েছেন -() হে আমাদের প্রতিপালক ! নিশ্চয়ই তুমি জান যা আমরা গোপন করি ও প্রকাশ করি । আকাশ ও যমীনে কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নয়। (সূরা ইবরাহীম-৩৮ )

তাঁর জ্ঞান সৃষ্টি জগতকে বেষ্টন করে রয়েছে

তিনি সদা সর্বত্র বিরাজমান এ কথার অর্থ হলো- আল্লাহ তা’য়ালার ইলম গোটা সৃষ্টি জগতকে বেষ্টন করে রেখেছে। তাঁর ইলমের ভেতরে রয়েছে সব। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- () নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা সর্ব বিষয়েয় সর্বশক্তিমান । আর আল্লাহ তা’য়ালা নিজে জ্ঞান দ্বারা সমস্ত কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন । (সূরা তালাক -১২ )
অর্থাৎ মহাবিশ্বে ও মহাবিশ্বের বাইরে যা কিছু রয়েছে এর মধ্যে অণুপরমাণু বা তার থেকেও অতিক্ষুদ্র কোনো বিষয় মহান আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। সমস্তকিছুই তাঁর জ্ঞানের জগতে বিরাজমান ,ক্ষুদ্রতম কোন বিষয় ও তাঁর জানার বাইরে নেই। অনুরূপভাবে তাঁর রহমতও সমস্ত সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে রয়েছে । মহান আল্লাহ বলেন- () আমার রহমত সকল জিনিসকেই পরিব্যপ্ত করে রয়েছে । (সূরা আরাফ- ১৫৬) নবীকরীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন -() যখন মহান আল্লাহতা’য়ালা যাবতীয় সৃষ্টি করলেন ,তখন তাঁর আরশের ওপরে একটি কিতাবে লিখেছেন ,নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার গযবের ওপর বিজয়ী হয়েছে। (বোখারী ,মুসলিম ,তিরমিযী)

শাসন কর্তৃত্বের আসনে তিনি সমাসীন

প্রকৃত বিষয় এটা নয় এবং মহান আল্লাহ তা’য়ালা সর্বত্র বিরাজমান নন। মূল কথা হলো আল্লাহ সব জায়গায় আছেনএবং তিনি সবত্র রিরাজমান এই কথার অর্থ হলো আল্লাহর ইলমে,আল্লাহ জ্ঞানের মধ্যে আল্লাহর নজরের সামনে গোটা সৃষ্টি জগত রয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোথায় রয়েছেন এই প্রশ্ন মানুষের মনে জাগবে ।মানুষ এই প্রশ্নের সঠিক জবাব কারো কাছ থেকে পাবে না। এ কারণে স্বয়ং আল্লাহ তা”য়ালাই এই প্রশ্নের জবাবএভাবে দিয়েছেন। () তিনি পরম দয়াবান ।বিশ্ব জাহানের শাসন কর্তৃত্বের আসনে তিনি সমাসীন। যা কিছু পৃথিবীতে ও আকাশে রয়েছে, যা কিছু পৃথিবী ও আকাশের মাঝখানে রয়েছে এবং যা কিছূ ভুগর্ভে রয়েছে সবকিছুর মালিক তিনিই ।তুমি যদি নিজের কথা উচ্চকন্ঠে বলো ,তবে তিনি তো চুপিসারে বলা কথা বরং তার চাইতেও গোপনে বলা কথাও জানেন। (সূরা ত্বা- হা -৫-৭)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন ,এই পৃথিবীতে তোমাদের স্থিতি অবস্থিতি ও তোমাদের শান্তি- নিরাপত্তা প্রত্যেক মুহুর্তেই আমার অনুগ্রহের ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল । তোমরা এখানে আনন্দ ফু’র্তি করছো ,অহঙ্কার প্রদর্শন করছো ,আমার বিধানে বিরুদ্ধে কথা বলছো, লিখছো ,মিছিল মিটিং করছো ,আমার আদেশের বিপরীত পথে জীবন পরিচালিত করছো। এসবকিছু তোমরা করছো তোমাদের নিজেদের ক্ষমতাবলে নয়। তোমাদের জীবনের এখানে অতিবাহিত প্রত্যেকটি মুহুর্ত মহান আল্লাহ তা’য়ালার সংরক্ষণ বা হেফাযতের পরিণতি মাত্র । তাঁর ইঙ্গিত যে কোনো মুহুর্তে প্রলঙ্করী ভূকম্পনের মাধ্যমএই যমীন তোমাদের জন্য আনন্দফু’র্তির স্থান না হয়ে কবরস্থানে পরিণত হতে পারে। তোমরা যেসব বিলাস সামগ্রী নির্মাণ করেছো,সুউচ্চ প্রাসাদ নিমার্ণ করেছো, তা মুহুর্তে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে মাটির সাথে মিশে যেতে পারে । () তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গিয়েছো সেই মাহন সত্তা সম্পর্কে যিনি আকাশে রয়েছেন ,এ ব্যাপারে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটির মধ্যে বিধ্বস্ত করে দিবেন এবং এই ভূ তল সহসা হ্যাচকা টান টল-টলায়মান হয়ে কাঁপতে শুরু করবে ?(সূরা মূলক১৬)
তোমরা কি এই ব্যাপারে নির্ভয় হয়ে গিয়েছো যে,তিনি আকাশে রয়েছেন তিনি তোমাদের ওপর প্রস্তর বর্ষণকারী প্রবলবায়ূ প্রবাহিত করবেন ?(সূরা মূলক ১৭ ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন () তোমরা পৃথিবীবাসীর প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানের ওপর যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন ।(আবু দাউদ, তিরমিজী )
এই হাদীসেও আল্লাহতা’য়ালার অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে, তিনি আসমানের ও আরশেআযীমে অবস্থান করছেন। আল্লাহ তা’য়ালা আরশে আযীমে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন -তোমাদের মধ্যে দিন ও রাতে পালাক্রমে আল্লাহর ফেরেশতারা যাওয়া আসা করে থাকেন। এই পালা পরিবর্তন হয় আসর ও ফজরের নামাযের সময়। এরপর যেসব ফেরেশতারা তোমাদের সাথে রাতে থাকেন,তারা আকাশে উঠে যান। তখন মহান আল্লা তা’য়ালা তোদেরকে প্রশ্ন করেন ,তোমরা আমার বন্দাকে কোন অবস্থায় ছেড়ে এসেছো? অথচ তিনি বান্দার অবস্থা সম্যক অবগত রয়েছেন । প্রশ্নের জবাবে ফেরেশতাগণ বলেন ,তাদেরকে নামায আদায়রত অবস্থায় রেখে এসেছি এবং তারা যখন নামায আদায় করছিলো, তখন তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছে ছিলাম। (বোখারী ও মুসলিম )
পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের সাথে আল্লাহ তা’য়ালা ফেরেশতা নিয়োজিত রেখেছেন । এই ফেরেশতারা ফজর ও আসরের সময় পালাপরিবর্তন করেন । এ জন্য এই সময় অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। রাতে যে ফেরেশতারা বান্দার সাথে থাকেন তাঁরা ফজরের নামাযের সময় চলেন যান এবং আরেক ফেরেশতা বান্দার কাছে আসেন। বান্দা যদি নামাযে থাকে তাহলে যে ফেরেশতা চলে গেলেন তিনি আল্লাহ তায়ালাকে জানান বান্দাকে নামায আদায়রত অবস্থায় ছেড়ে এসেছি। আর যিনি এলেন তিনিও আল্লাহ তায়াকে জানান ,বান্দাকে নামায আদায়রত অবস্থায় পেয়েছি । এভাবে আসরের সময়ও ফেরেশতাদের পালা পরিবর্তন হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন -() তোমরা কি আমাকে বিশ্বস্ত বলে স্বীকৃতি দাও না ? আমি তো ঐ সত্তার কাছে বিশ্বস্ত যিনি আকাশের ওপর রয়েছেন। সকাল ও সন্ধ্যায় আমার কাছে আকাশের সংবাদ এসে থাকে । (বোখারী ও মুসলিম)